জলে কুমীর; ডাঙ্গায় বাঘ

এডিটরের নোটঃ আজকের এই সুন্দর লেখাটি দিয়ে শুরু হলো আমাদের “গেস্ট পোস্ট”। আশা করি সালমা সুলতানা তাজিয়া-র এই লেখাটি আমাদের অতিথি লেখকদের অনেক সুন্দর সুন্দর লেখার প্রথমটি। আপনার মতামত দিতে ভুলবেন না কিন্তু। এতে লেখকের আনুপ্রেরণা বাড়ে। ধন্যবাদ।

……………………………………………………………………………………………………………………

“জলে কুমীর; ডাঙ্গায় বাঘ” এই পরিস্থিতিতে আমরা কেউ পরতে না চাইলেও, জলের কুমীর আর ডাঙ্গার বাঘ দেখার শখ সবারই আছে; অবশ্যই নিরাপদ দূরত্ব থেকে!
ছোটবেলার একটা ঘটনা। গ্রামে গিয়েছি মেঝ মামার বিয়েতে। বিয়েবাড়িতে পৌঁছে আমার বয়সের কয়েকজনের সাথে খাতির হয়ে গেল নিমিষেই। সেই বাড়ির পাশেই এক খাল। একজন বললো, এই খালে নাকি কুমীর আছে! চিড়িয়াখানা দেখার পর থেকেই মুক্ত বাঘ, কুমীর, বানর ইত্যাদি দেখার শখ ছিল। তো এত কাছে থেকে কুমীর দেখা যাবে শুনে বললাম “কুমীর দেখাও দেখি”! একজন তাদের বাড়ির কোষা নৌকা নামিয়ে ফেলল। মহা উৎসাহে নৌকায় উঠলাম কুমীর দেখব বলে। এমন সময় দেখি ডাঙ্গায় বাঘ! মানে বড় মামা কোমরে হাত দিয়ে চোখের ইশারায় নৌকা থেকে নামতে বলছে। আমি “জলের কুমীর” দেখার অভিযান শেষ না করেই “ডাঙ্গার বাঘ” এর ইশারায় সুড়সুড় করে নেমে আসলাম।আমার কুমীর দেখার শখ অপূর্ণই রয়ে গেল।

শখ পূরণ হল এইবার সুন্দরবন যেয়ে। সুন্দরবনের খুলনা রেঞ্জে। গত বছরের (২০১২) ডিসেম্বরের মাঝামাঝি তিন দিনের ট্যুরের দ্বিতীয় দিনে দেখলাম। বিকেল তিনটার পর পর হবে। ছিটে কটকা খাল এর মোটামুটি কাছে দিয়ে যাওয়ার সময় দূর থেকে দেখছিলাম খাল এর পাড়ে একটা শুকনো খটখটে গাছের ডাল পড়ে আছে। আস্তে আস্তে সেই ডালটি কুমীর হয়ে গেল! আহ্ কি আনন্দ সেই কুমীর দেখার! সবার দেখার সুবিধার্থে নিরাপদ দূরত্ব রেখে লঞ্চ থামিয়ে দেয়া হল। ছোটোরা অবাক হয়ে কুমীর দেখছে, আমিও তাদের সাথে দেখছি। হঠাৎ কুমীরটা একটু নড়েচড়ে উঠলো, মনেহয় আমাদের দেখে বিরক্ত। আস্তে আস্তে এক পা- দু’পা করে জলের দেবতা জলে নেমে পড়লেন। কিন্তু পুরোপুরি ডুব দিলনা, নাকটা ভাসিয়ে একটু অপেক্ষা করল কি মনে করে। তারপর যেই ডুব দিল, ছোটোরা সব চিৎকার করে উঠলো এই ভেবে যে কুমীর তাদের দিকে আসছে। তবে আমি খুব রোমাঞ্চিত, অবশেষে মুক্ত কুমীর দেখে।

DSC_5649

এই যাত্রায় কুমীর আরও দেখলাম। তবে সেগুলো দেখলাম করমজল প্রাণী প্রজনন কেন্দ্রে। বাচ্চা বাচ্চা সব কুমীর থেকে ইয়া বড় কুমীরের দেখা মিলল এখানে। সময় হলে এদেরকে অবমুক্ত করে দেয়া হয়।শুনলাম এই প্রাণী প্রজননকেন্দ্রে ছোট-বড় মিলিয়ে ১৩৩টি নোনা পানির এবং ৩টি স্বাদু পানির কুমীর ছিল। ঘুর্ণিঝড় আইলার সময় নাকি এই কেন্দ্রে থাকা ৬১টি কুমীর ভেসে যায়। সব মিলিয়ে কুমীর দেখার শখ আমার ভালই মিটল। আমি কুমীর দেখেই খুশীতে আটখানা; বাঘ না দেখলেও এ যাত্রায় চলবে।

DSC_5923

DSC_5926

পরে ট্যুর গাইড এর সাথে কথা হল কুমীর নিয়ে। জানতে চাইলাম কুমীর প্রায়ই দেখ যায় কিনা। উনি বললেন, “আমি তো রেগুলার সুন্দরবন আসা-যাওয়া করি। এইবার অনেক বছর পরে দেখলাম। এখন আর এদেরকে এত সহজে দেখা যায়না। নানা কারনে সংখ্যায় কমে যাচ্ছে।” টুরিস্টদের জন্য উনার ভাষ্য ছিল, “সবাই দেখবেন খাওয়ার পর উচ্ছিষ্ট এই পানিতেই ফেলছে। প্লাস্টিকের কৌটা, চিপসের প্যাকেট আরও কত হাবিজাবি। এদের সতর্ক করে দেই আমরা। এভাবে একটু একটু করেই কিন্তু পানি-দূষণ বেড়েই চলেছে। হুমকির মুখে পড়ছে বন ও বন্যপ্রাণীরা।”

সুন্দরবন থেকে ফেরার পথে ভাবছিলাম, একসময় নাকি গ্রামে-গঞ্জে বাগডাস-শিয়াল থেকে শুরু করে গুইল-এর দেখা মিলত অহরহ। আর এখন গ্রামে তো দূরে থাকুক, খোদ সুন্দরবনেই এদের দেখা মেলা ভার! আমরা যদি এখনই সচেতন না হই, তাহলে পরবর্তী জেনেরাশেন কি শুধু গল্পই শুনে যাবে যে “এক দেশে ছিল এক কুমীর?”

Advertisements
This entry was posted in Nature, Photography, Travel and tagged , , , , , , . Bookmark the permalink.

9 Responses to জলে কুমীর; ডাঙ্গায় বাঘ

  1. Welcome to the world of blogging.. great start..

  2. আনিকা তামজিদা says:

    লেখাটা পড়ে এখনি সুন্দরবন যেতে মন চাচ্ছে… আশা করি এমন সুন্দর সুন্দর লেখা আরো পড়তে পারব…

    • তাজিয়া-র লেখার হাত আছে সেটা বলাই বাহুল্য। সবচেয়ে বড় আশার কথা এই যে, এই লেখা থেকে তার ব্লগিং-এর প্রবল ইচ্ছা জাগ্রত হয়েছে। নতুন একজন ব্লগারকে ব্লগিং ওয়ার্ল্ডে তাকে স্বাগত জানাই… 🙂

  3. Tajia says:

    ধন্যবাদ আরিফ।
    “লেখার হাত আছে”- আমার এইটা বোঝার মত মগজ ছিল না… :p আইডিয়া ফ্যামিলি কে অনেক ধন্যবাদ আমাকে উৎসাহ দেয়ার জন্য। সৃজনশীল এই ফ্যামিলি কোন না কোনভাবে তাদের হৃদয় দিয়ে আমার মগজ কে জাগিয়ে তুলেছে! আমি কৃতজ্ঞ ! 🙂

    • এত অমায়িক হবার কোন দরকার নাই। আপনার লেখার হাত আছে এটা বলেই আমরা ক্ষান্ত হবো না। আপনার নিজের ব্লগটা কবে শুরু করছেন সেটা বলেন। 🙂

  4. Tajia says:

    ইয়ে… আসলে শুরু করে দিব… শিগগির- ই করব। 🙂

  5. অনেক ভালো লিখেন আপনি সেটা বলতেই হচ্ছে । ট্যুর টা যে চমৎকার হয়েছে তা লেখার মধ্যেই ফুটে উঠেছে ।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s