উপলব্ধি

এডিটরের নোটঃ আজকের এই সুন্দর গেস্ট পোস্ট-টা লিখেছেন আমাদের কন্ট্রিবিউটর সালমা সুলতানা তাজিয়া। মালেশিয়াতে প্রবাস জীবন কাটাচ্ছেন আর আমাদের জন্য লিখে পাঠাচ্ছেন সুন্দর সুন্দর সব অভিজ্ঞতার কাহিনী। আজ এরকম অভিজ্ঞতার প্রথমটা পোস্ট করা হলো; আশা করা যায় তিনি এরকম আরও লেখা নিয়ে আসবেন আমাদের জন্যে। আপনার মতামত দিতে ভুলবেন না কিন্তু। এতে লেখকের আনুপ্রেরণা বাড়ে। ধন্যবাদ।

………………………………………………………………………………..

মাত্র কয়েক মাস হল প্রবাসী আমরা। কুয়ালালামপুর থেকে অনেক দূরে কুয়ান্তান (Kuantan)। সেই কুয়ান্তান থেকেও ৩০ মাইল ভিতরে ছোট্ট শহর গাম্বাং (Gambang)। ইউনিভার্সিটির যে বাসায় আমরা থাকি সেটা পাহাড় ঘেষা। আশেপাশে লোকালয় অত নেই, একদম শান্ত পরিবেশ চারিদিকে। গ্রাম খুব দূরে নয় এখান থেকে, তাই টাটকা শাকসবজি পেয়ে যাই প্রায়ই । এখানে প্রতি বৃহস্পতিবার বিকালে একটা হাট বসে, “পাসার মালাম” (Pasar Malam) বলে মালয়রা। সেখানে গেলেই দেখা মিলে কৃষকদের, সাথে টাটকা শাকসবজি, ফল, মাছ – সব। এত কথা বলছি যার কথা বলব বলে, এবার একটু সেদিকে যাই। পাসার মালাম ছাড়া গাম্বাং এ একটা ছোট্ট বাজার আছে যেখানে দরকারী বাজার-সদাই পাওয়া যায়। বিশেষ করে সবজী, ফল আর মাছ। একদম প্রথম যেদিন সেখানে গেলাম খুশী হলাম দেখে যে বাংলাদেশের প্রায় সব সব্জিই পাওয়া যায়। আর ফরমালিন-এরও ভয় নেই। সবমিলিয়ে ৬/৭ টা দোকান হবে।

1900039_637960299597070_1885394664_nহঠাত ভিমড়ি খেলাম এক দোকানদারকে দেখে ! প্রথমে অবশ্য বুঝতেই পারিনি যে  উনিই এই দোকান চালান। একজন ভদ্রমহিলা; চাইনিজ। ভিমড়ি খাওয়ার কারন উনি মহিলা বলে নন, উনার বয়স! কত হতে পারে বয়স আন্দাজ করার চেষ্টা করলাম। কিছুতেই ৭০-এর নিচে ভাবতে পারছি না। বেশিও হতে পারে। এইরকম একজন বৃদ্ধা কিভাবে দোকান চালাচ্ছেন ভেবে পেলাম না। আসলে আমি যে এত বৃদ্ধ কাউকে এভাবে কাজ করতে দেখে অভ্যস্ত নই। হঠাত টনক নড়ল বৃদ্ধার ডাক শুনে। দোকানের সামনে সাঁড়িতে দাঁড়িয়ে দেখে ডেকে জানতে চাইলেন – কি লাগবে; অবশ্যই মালে ভাষায়। উনি ইংরেজী জানবেন না এইটাই স্বাভাবিক। আমি ভিতরে ঢুকে কিছু সবজী নিলাম। আর ভালো করে দেখলাম এই বৃদ্ধাকে। এমনকি উনার কাজে সাহায্য করার জন্য একটা বাড়তি লোক-ও নেই। সাদা ধবধবে চুল; ছোট করে কাটা। সবসময়ই হাসি লেগে আছে চেহারায়। এখনও কুঁজো হয়ে যাননি; তবে সোজা হয়ে দাঁড়াতে একটু কষ্ট হয় যেন। এমন সময় আমার সাথের দেশী ভাই এসে উনাকে “আন্টি” সম্বোধন করে টুকটাক মালে ভাষায় কথা বলে কিছু সব্জি নিলেন। পরে শুনেছিলাম আন্টি ডাকলে খুশী-ই হন। না, দাদীর বয়সে আন্টি ডাক শুনতে পেরে খুশী হন তা নয়। বরং একজন সবজী বিক্রেতা কে সম্মান দিয়ে আন্টি ডাকা হচ্ছে এইটা বুঝতে পেরেই খুশী হন, তাও ভিনদেশী কেউ সন্মান করছে।

1601389_637960426263724_1295886235_nএরপর অনেকবার দেখা হয়েছে সেই বৃদ্ধা আন্টির সাথে। একবার দোকানে উনার সাথে মালে ভাষায় কথা বলছেন এক ভদ্রলোক। তাকে বললাম আন্টির কাছে জেনে আমাকে জানাতে , উনার বয়স কত। সেই ভদ্রলোকই জবাব দিলেন, আন্টির বয়স ৮৬ ! খুব সম্ভবত ভদ্রলোক আন্টির ছেলে। সত্যি বলতে আন্টিকে দেখে অনুপ্রাণিত হয়েছি। এই বয়সেও উনি বসে নেই। শুধু যে টাকার প্রয়োজন বলে কাজ করছেন তা কিন্তু নয়। আমি দেখলাম বেশীর ভাগ চাইনিজরাই যতক্ষণ শরীরে কুলায়, কাজ করছে। অযথা ঘরে বসে সময় কাটানোর কথা মনে হয় এরা জানেই না! আমাদের দেশে এই বয়সের নানী/দাদী’রা ঘরেই সময় কাটান। এটাতেই আমি অভ্যস্ত ছিলাম। তাই হঠাত করে এমন বয়সের কাউকে দিব্যি কাজ করতে দেখে অবাক না হয়ে যাই কোথায় আর! উনারা নিজেদের বাহন নিজেরা চালিয়ে দোকানে আসেন, নিজের হাতে সবকিছু ঠিকাঠাক করে দোকান খুলেন ; কারো উপরেই যেন নির্ভরশীল হয়ে থাকতে পছন্দ করেন না । অবশ্য  বেশীর ভাগ চাইনিজদের বেলায়ই এরকম দেখেছি; মালে’রা অত পরিশ্রমী নয়। এইসব দেখে মনে হল বয়সটা আসলেই শরীরে না, মনেই হয় আগে। তারপরে আস্তে ধীরে শরীরে ভর করে। মনটা যদি জীবনের চাঞ্চল্য কে সঙ্গী করতে পারে, তবেই না জীবনে গতি আসবে।

1922149_637960359597064_1754435935_n

ঢাকা থেকে এসে এই শান্ত পরিবেশ যে কি ভালো লাগছে। প্রতিটা দিন-ই উপভোগ করছি। মনে হচ্ছে মালয় দেশের প্রায় গ্রামেও ঢাকা থেকে অনেক ভালো আছি, ফুরফুরে মেজাজে দিন যাচ্ছে । আর সেই বৃদ্ধা আন্টিদের কর্মক্ষমতা দেখে বয়স নিয়ে আর ভাবছি না। চাইলে কেউ ৮০ বছর বয়সেও যে এমন জোয়ান থাকতে পারে তা এখানে না আসলে দেখা মিলতো কিনা কে জানে! আমিও মনটাকে চাগিয়ে রাখছি, আরো অনেক কাজ করতে হবে যে! জীবনের চাঞ্চল্য কে ধরে রাখা যায় যেন কাজের মাধ্যমেই, তা সে  যতই বয়স হোক। এই উপলব্ধি আমাকে কতটা ভাবিয়েছে প্রথমে তা আর বলছি না, তবে ভাবিয়ে ভাবিয়ে ঠিক লাইনে নিয়ে এসেছে!

Advertisements
This entry was posted in Photography, Travel and tagged , , , , , , . Bookmark the permalink.

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s